এক রকম প্রতিশোধই বলা যায়। আফগানিস্তানের বিপক্ষে এর আগে সাদা পোশাকের প্রথম দেখাতেই পরাজিত হয়েছিল বাংলাদেশ। চার বছর আগের হারের প্রতিশোধ দারুণভাবে নিল বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে বাংলাদেশকে তারা বড় ব্যবধানে হারিয়েছিল। সেই আফগানিস্তানের বিপক্ষেই এবার লিটন দাসের দল দেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় জয়ের রেকর্ড গড়েছে। একমাত্র টেস্ট খেলতে এসে ৫৪৬ রানের পাহাড়সম ব্যবধানে হারের স্বাদ পেয়েছে আফগানরা। পাঁচ দিনের টেস্ট ম্যাচ শুরু হওয়ার পর ক্রিকেটবিশ্ব এত বড় জয় আর দেখেনি।
এর আগে ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জয়ের রেকর্ড গড়েছিল ইংল্যান্ড। ১৯২৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাঠেই ইংলিশরা ৬৭৫ রানে জয় পেয়েছিল। এরপর ১৯৩৪ সালে সেই অস্ট্রেলিয়াই এবার ইংল্যান্ডের মাঠে গিয়ে স্বাগতিকদের ৫৬২ রানে হারায়। তবে সে সময় টেস্ট ম্যাচ গড়াতো তিন-চার-পাঁচ কিংবা সীমাহীন দিনে। ১৯৫০ সালের পর পাঁচদিনের টেস্ট ম্যাচের সূচি নির্ধারিত হয়। সেই হিসেবে আধুনিক ক্রিকেটে পাওয়া সবচেয়ে বড় জয়টি বাংলাদেশের দখলে।
তবে শুধু রানের হিসাবে (ইনিংস ব্যবধান বাদ দিলে) টেস্ট ইতিহাসের এটি তৃতীয় বৃহত্তম জয়। একইসঙ্গে চলতি শতাব্দীতেও এটি সবচেয়ে বড়। আফগানিস্তানের বিপক্ষে এই টেস্টে নাজমুল হোসেন শান্ত এবং মুমিনুল হকের জোড়া সেঞ্চুরিতে ৬৬২ রানের বিশাল লক্ষ্য দেয় স্বাগতিকরা। সেই রান তাড়ায় সফরকারীরা মাত্র ১১৫ রানেই থেমে যায়।
কেবল রানের ব্যবধানেই নয়, বাংলাদেশের স্মরণীয় জয়ের ম্যাচে টাইগাররা রেকর্ডবইয়ে পৃথক একাধিক ক্ষেত্রে নাম তুলেছে। দুই ইনিংস মিলিয়ে মাত্র ৪৩২ বল খেলতে পেরেছে আফগানিস্তান। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেটি রেকর্ড। এর আগে টাইগাররা ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সর্বনিম্ন ৫৭৬ বলের মধ্যে দুবার অলআউট করেছিল। মিরপুরের সে ম্যাচটি তারা জিতেছিল ইনিংস ও ১৮৪ রানে। সবমিলিয়ে প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে কম বলের মধ্যে দুবার অলআউট করে দেওয়ার রেকর্ডটি ইংল্যান্ডের। ১৮৯৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে দুবার অলআউট করতে তাদের লেগেছিল মাত্র ২৪৮ বল।
মিরপুর টেস্টে ব্যাটারদের পর বোলিং তোপ দেগেছেন স্বাগতিক পেসাররা। তাসকিন আহমেদ, এবাদত হোসেন এবং শরীফুল ইসলামরা দুই ইনিংসে আফগানদের ১৯ উইকেটের ১৪টিই নিয়েছেন। এর মাধ্যমে ঘরের মাঠে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড গড়লেন টাইগার পেসাররা। এর আগে দেশের মাঠে বাংলাদেশের পেসারদের সর্বোচ্চ ১০ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড ছিল। ২০০২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চট্টগ্রামে তারা ওই কীর্তি গড়েছিলেন।

বাংলাদেশের হয়ে সাদা পোশাকে নিয়মিত অধিনায়ক সাকিব আল হাসান চোটের কারণে দলের বাইরে আছেন। তার অনুপস্থিতিতে সহকারী অধিনায়ক লিটন দাস এই ম্যাচে টাইগারদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। অধিনায়ক হিসেবে তার অভিষেকে ম্যাচেই বাংলাদেশ এত বড় জয়ের রেকর্ড গড়ল। এর আগে ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে অধিনায়কত্বের অভিষেকে জয় পেয়েছিলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। যদিও সে ম্যাচে তিনি এক ইনিংস ব্যাটিংয়ের পর ৬.৩ ওভার বোলিং করে চোটের কারণে উঠে গিয়েছিলেন। ক্যারিয়ারে এরপর আর টেস্টও খেলেননি তিনি। ফলে সিরিজের পরের টেস্টে মাশরাফির অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সাকিব। টেস্টে অধিনায়কত্বের অভিষেকে সাকিব দ্বিতীয় বিজয়ী। এবার তার স্থলাভিষিক্ত লিটনও একই স্বাদ পেয়েছেন।
সাকিব, তামিমকে ছাড়া লিটন অ্যান্ড কোং অতিথিদের বড় ধাক্কাই দিল।
ঢাকা টেস্টে মিরপুরের হালকা ঘাসের উইকেটে চতুর্থ দিনে পেসারদের দাপটে ল-ভন্ড আফগানিস্তান শিবির। একদিন হাতে রেখে ৫৪৬ বিশাল ব্যবধানে জয় তুলে নিলো লিটন দাসের দল। ব্যাটারদের দারুণ নৈপুণ্য এবং বোলারদের দারুণ নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের এতবড় জয়ের দেখা পেলো বাংলাদেশ দল।
প্রথম ইনিংসে উইকেট ছিল না তাসকিন আহমেদের। বিষয়টা বেমানানই। তবে দ্বিতীয় ইনিংসেই স্বরূপে ফিরেছেন। আফগান শিবিরে একাই ধস নামালেন তাসকিন। একে-একে তাসকিন তুলে নিলেন ৪ উইকেট। এতেই ৬৬২ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়ায় ১১৫ রানে থেমেছে সফরকারীরা। ফলে ৫৪৬ রানের জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।

আগের দিনের ২ উইকেটে ৪৫ রান নিয়ে চতুর্থ দিনের খেলা শুরু করেছিল আফগানিস্তান। পাহাড়সম লক্ষ্যের চাপ এদিনও তাদের ব্যাটে ফুটে ওঠেছে। আর সকাল বেলা উইকেট থেকে যেটুকু বাড়তি সুবিধা নেয়ার তার সবটাই নিয়েছেন বাংলাদেশি পেসাররা। চতুর্থ দিনে সাফল্যের দেখা পেতে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয়েছে মাত্র ১৫ বল।
চতুর্থ দিনের প্রথম সাফল্য আসে পেসার ইবাদত হোসেনের হাত ধরে। দুর্দান্ত লাইন। দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে তেমন কিছু করার ছিল না নাসির জামালের। অফ স্টাম্পে গুডলেংথ থেকে লাফিয়ে ওঠা বলে শুধু খোঁচাই দিতে পারলেন নাসির। দিনের ১৫তম বলে প্রথম আঘাত করলেন ইবাদত। পরের উইকেটের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি বাংলাদেশের। শরীফুলের বলে ফিরতে হলো আফসার জাজাইকে। রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে করা বলটিতে এজড হয়েছেন আফসার, ক্যাচ গেছে তৃতীয় স্লিপ থেকে একটু সরে থাকা মেহেদী হাসান মিরাজের কাছে। আফসার ফিরেছেন ১২ বলে ৬ রান করে, আফগানিস্তান চতুর্থ উইকেট হারিয়েছে ৬৫ রানে।

চতুর্থ দিনে প্রথম সেশনে শরীফুলের দ্বিতীয় আঘাত। মিডল স্টাম্পে পিচ করা বাউন্সার লাইন ধরে রেখে বেরিয়ে যাচ্ছিল অফ স্টাম্প দিয়ে। ব্যাট এগিয়ে খোঁচা মারেন বাহির শাহ। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি। বল চলে যায় তৃতীয় স্লিপে দাঁড়ানো তাইজুল ইসলামের হাতে। ১৩ বলে ৭ রান করে আউট অভিষিক্ত বাহির।
টেস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে (রানে) জয়ের রেকর্ড
১. ৬৭৫ রানে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়াকে (১৯২৮, ব্রিসবেন)
২. ৫৬২ রানে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডকে (১৯৩৪, ওভাল)
৩. ৫৪৬ রানে বাংলাদেশ-আফগানিস্তানকে (২০২৩, মিরপুর)