নগরীর চকবাজার এলাকায় পুলিশের প্রশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন ‘সোর্স’ রুবেল। ব্যস্ত রাস্তায় চায়ের দোকান ও ফুটপাতে খড়ের ব্যবসা করছেন চকবাজার থানার ‘সোর্স’ হিসেবে পরিচিত এই রুবেল। শুধু রাস্তা-ফুটপাত দখল নয়, মাদক বিক্রির সঙ্গেও জড়িত তিনি। রুবেল এখন চকবাজার এলাকার আতঙ্কের এক নাম। এলাকায় কথায় কথায় মানুষকে পুলিশের ভয় দেখানো তার নিয়মিত কাজ। মাদকসহ একাধিক মামালার আসামি হলেও পুলিশের সঙ্গে বেশ সখ্যতা রুবেলের। তার ফোন পেলে মুহূর্তেই থানা থেকে ছুটে আসে পুলিশ।
অভিযোগ আছে, বিভিন্ন অভিযানে পুলিশের সঙ্গেও নিয়মিত থাকেন ‘সোর্স’ রুবেল। আবার রাত হলে টহল পুলিশের সঙ্গে গাড়িতে ঘুরে বেড়ান। সুযোগ পেলে নিরীহ লোকজনকে তল্লাশির নামে ফাঁসান মাদক দিয়ে। পকেটে সবসময় ইয়াবা ও গাঁজা নিয়ে ঘুরেন রুবেল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সোর্স রুবেলের সঙ্গে বেশ সখ্যতা চকবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো. সারোয়ার আযমের। তিনি চকবাজার থানায় দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। তার ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চলেন ‘সোর্স’ রুবেল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চকবাজার থানার এসআই সারোয়ার আযম সোর্স রুবেলকে তার ব্যক্তিগতসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করেন। ঘরের বাজার-সদাইও করান। সেই সুবাদে ব্যস্ত রাস্তা দখল করে প্যারেড কর্ণার এলাকায় তাকে চায়ের দোকান বসানোর সুযোগ করে দিয়েছেন এসআই সারোয়ার আযম নিজেই। এছাড়া একই জায়গায় ফুটপাত দখল করে এখন খড় বিক্রিরও ব্যবস্থা করে দিয়েছেন তিনি। ওই এলাকায় আর কেউ এই ব্যবসা করতে পারছেন না রুবেলের ভয়ে। করলেই তাকে গিয়ে পুলিশের ভয় দেখানো হচ্ছে। পুলিশের হয়ে এলাকায় ভাসমান দোকান থেকে নিয়মিত টাকা তুলেন রুবেল।
অবশ্য ‘সোর্স’ রুবেল প্রতিবেদকের কাছে অকপটেই সবকিছু স্বীকার করে বলেন, এসআই মো. সারোয়ার আযম তাকে ছোট ভাই হিসেবেই দেখেন। ব্যবসা করার সুযোগ দিয়েছেন। তার হয়েই নিয়মিত কাজ করেন রুবেল। ডাকলেই ছুটে যান।
সরেজমিন চকবাজার প্যারেড কর্ণার এলাকায় গিয়ে ‘সোর্স’ রুবেলের রাস্তা-ফুটপাত দখলের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া একই জায়গার ২-৩ স্পটে রাস্তা-ফুটপাত দখল করে চলছে খড়ের ব্যবসা। ফলে ওই এলাকার রাস্তায় বেড়েছে যানজট। পথচারীরা ফুটপাতে হাঁটতে না পেরে ঝুঁকি নিয়ে হাঁটছে রাস্তায়। এসময় ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সোর্স রুবেলকে যানজট নিয়ন্ত্রণ দায়িত্ব পালন করতে চোখে পড়ে। তবে রাস্তা-ফুটপাতে খড়ের ব্যবসায় কারো যেন নজর নেই।
আশপাশের দোকানি ও স্থানীয়রা জানান, ‘সোর্স’ রুবেল ভয়ঙ্কর। চায়ের দোকানের আড়ালে প্রতিদিন গাঁজা বিক্রি করে। সারাদিন দোকান বন্ধ থাকে শুধু সন্ধ্যায় খুলে বসে। দোকানে তেমন মালামালও নেই। রাত হলেই দোকানের আশপাশে প্রকাশ্যে গাঁজা সেবন চলে। গাঁজার দুর্গন্ধে অতীষ্ঠ হয়ে উঠে পথচারীরা। কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো তাকে পুলিশ ও মাদক দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখানো হয়।
আরো জানা গেছে, প্রতিদিন গভীর রাতে কলেজের পূর্ব গেইট এলাকায় পুলিশের টহল গাড়ির সঙ্গে থেকে সাধারণ মানুষকে তল্লাশি করেন রুবেল। সুযোগ বুঝে ইয়াবা-গাঁজা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নেন টাকা। ভুক্তভোগীরা ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারে না। করলে উল্টো বিপদে পড়তে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, ‘সোর্স’ রুবেল এলাকায় কথায় কথায় পুলিশের ভয় দেখায়। রাতে সাধারণ মানুষ ও পথচারীদের পুলিশ দিয়ে অযথা হয়রানি করে। কেউ নাকি তার কিছু করতে পারবে না। কারণ থানা-পুলিশ নাকি তার হাতের মুঠোয়। তার কথায় উঠে-বসে।
অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে রাস্তায় দোকান ও খড়ের ব্যবসার কথা স্বীকার করে ‘সোর্স’ রুবেল জাগো চট্টগ্রামকে বলেন, আমি এখানকার স্থানীয়। আগের আমার বাবা এই ব্যবসা করত। এখন আমি করি। আপনি বললে আমি আপনাকে দেখব, খুশি করব। আমি চার বছর ধরে কোনো খারাপ কাজে নাই। আমি শুধু পুলিশের টাকাগুলো তুলে দিই। আর সারোয়ার স্যার ডাকলে অভিযানে সঙ্গে যাই। উনার ঘরে বাজার-সদাই করে পৌঁছে দিই। এসব না করলে আমাকে আবার ঢুকাই দিবে বিশ্বাস করেন।
মাদক বিক্রির বিষয়ে ‘সোর্স’ রুবেল বলেন, আল্লার কসম আমি মাদক বিক্রি করি না। কাউকে মাদক দিয়ে ফাঁসায় না। প্রয়োজনে আমি দোকান তুলে ফেলব। আমি আপনার সাথে দেখা করব। আমার আইডি কার্ড আপনাকে দেব। আমার বন্ধুও একটি দৈনিক পত্রিকায় কাজ করে। তার কাছে আমার বিষয়ে জানতে পারবেন। আপনি আসেন, আমার বাসা দেখে যান। এসআই সারোয়ার স্যার আমাকে ছোট ভাইয়ের মত দেখেন এবং ব্যবসা করার সুযোগ করে দিয়েছেন। আপনিও আমাকে ছোট ভাইয়ের চোখে দেখেন। আপনার সাথে পরিচয় হলে আপনাকে আমি কাজ দেব, দেখব। আমার ব্যবসা বন্ধ করবেন না।
‘সোর্স’ রুবেলকে প্রশ্রয় ও সখ্যতার বিষয়ে জানতে চকবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো. সারোয়ার আযমের মুঠোফোনে গত ১০ জুন (সোমবার) রাতে ৮টার দিকে কল করা হলে তিনি জাগো চট্টগ্রামকে বলেন, আপনি (প্রতিবেদক) কোথায় আছেন এখন? আশপাশে আছেন নাকি? আপনি আমার অফিসে আসেন এক কাপ চা খেয়ে সব কথা বলব। এরপর তিনি দিদার মার্কেট এলাকায় কাজে ব্যস্ত আছেন জানিয়ে পরে ফোন করতে বলেন।
পরদিন ১১ জুন (মঙ্গলবার) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে এসআই মো. সারোয়ার আযমের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি আর ধরেননি।
এসব বিষয়ে জানানো হলে চকবাজার জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) নুরে আল মাহমুদ জাগো চট্টগ্রামকে বলেন, বিষয়টি আমি দেখছি এবং ব্যবস্থা নিচ্ছি।
জেসি